নির্বাহী সারাংশ
বাংলাদেশের ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং (ডিই) প্রোগ্রাম বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড (বিটিইবি)-এর অধীনে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটগুলোতে পরিচালিত হয়। এর লক্ষ্য হলো মধ্য-স্তরের ব্যবহারিক দক্ষতাসম্পন্ন কারিগরি পেশাজীবী তৈরি করা। কিন্তু বাস্তবে এই প্রোগ্রামটি দেশি-বিদেশি চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতামূলক স্নাতক তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছে। পুরনো পাঠ্যক্রম, অপর্যাপ্ত অবকাঠামো, উচ্চ ঝরে পড়ার হার এবং উচ্চশিক্ষার সীমিত সুযোগের কারণে স্নাতকরা প্রান্তিক হয়ে পড়ছেন ও বেকারত্ব/অল্প বেতনের শিকার হচ্ছেন। এর সাথে যুক্ত হয়েছে ইংরেজি ভাষায় চরম দুর্বলতা, যা আন্তর্জাতিক জ্ঞান, টেকনিক্যাল ডকুমেন্টেশন ও বিশ্ববাজারের সুযোগ থেকে তাদের বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। এই কেস স্টাডিটি এই ব্যর্থতার মূল কারণ বিশ্লেষণ করে এবং সংস্কারের প্রস্তাবনা দিচ্ছে।
ভূমিকা
বাংলাদেশে ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং একটি চার বছরের কারিগরি শিক্ষা কোর্স (এসএসসি-পরবর্তী)। দেশে ৫২টি সরকারি পলিটেকনিকে প্রতি বছর ১ লক্ষ ৩০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী ভর্তি হয়। সিভিল, মেকানিক্যাল, ইলেকট্রিক্যাল, কম্পিউটারসহ বিভিন্ন বিভাগে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রতি বছর প্রায় ২৫,০০০ স্নাতক বের হয়। কিন্তু গুণগত মানের অভাব, পদোন্নতির সীমাবদ্ধতা এবং বি.এসসি. ইঞ্জিনিয়ারদের সঙ্গে বৈষম্যের কারণে ২০২৫ সালেও ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়াররা রাস্তায় আন্দোলন করছে।
ডিপ্লোমা প্রোগ্রামের প্রধান সমস্যাসমূহ
১. পুরনো ও শিল্প-অপ্রাসঙ্গিক পাঠ্যক্রম
২০০০ সালে কোর্স ৩ থেকে ৪ বছর করা হলেও এআই, রোবোটিক্স, অটোমেশন, সাসটেইনেবল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মতো আধুনিক বিষয় খুবই কম। বেশিরভাগ পড়াশোনা তাত্ত্বিক ও পুরনো প্রযুক্তি-ভিত্তিক।
২. অবকাঠামোগত দুরবস্থা
- ল্যাব সরঞ্জাম পুরনো বা অকেজো
- বিদ্যুৎ-ইন্টারনেটের সমস্যা
- শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত ১:১৪৪ (আদর্শ ১:২০)
- শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ প্রায় নেই
৩. উচ্চ ঝরে পড়ার হার
অর্থনৈতিক চাপ, রাজনৈতিক সহিংসতা, সমাজের নিম্নমুখী দৃষ্টিভঙ্গি ও ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার কারণে অনেকে পড়াশোনা ছেড়ে দেয়।
৪. পেশাগত প্রান্তিকীকরণ
- সরকারি চাকরিতে সর্বোচ্চ ১০ম গ্রেড (সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার)
- উচ্চ পদে যাওয়ার পথ প্রায় বন্ধ
- বি.এসসি. ইঞ্জিনিয়ারদের সঙ্গে বৈষম্যমূলক কোটা
ইংরেজি দুর্বলতা: আন্তর্জাতিক জ্ঞান থেকে বিচ্ছিন্নতার সবচেয়ে বড় কারণ
- বিশ্বের সব টেকনিক্যাল জার্নাল, স্ট্যান্ডার্ড, সফটওয়্যার ম্যানুয়াল ইংরেজিতে
- বাংলাদেশ ২০২৪ সালের EF English Proficiency Index-এ ৬২তম (লো প্রফিশিয়েন্সি)
- ডিপ্লোমা কারিকুলামে সপ্তাহে মাত্র ২-৩ ঘণ্টা ইংরেজি, তাও গ্রামার-কেন্দ্রিক, কথা বলা বা টেকনিক্যাল ইংরেজি নেই
- ফলে স্নাতকরা IEEE পেপার, AutoCAD/MATLAB ডকুমেন্ট, আন্তর্জাতিক টেন্ডার ডকুমেন্ট বুঝতে পারেন না
- বিদেশি কোম্পানি বা আউটসোর্সিং চাকরিতে IELTS/TOEFL-এর প্রয়োজন; অধিকাংশের স্কোর ৫.৫-এর নিচে
- নিয়োগকর্তারা বলেন: ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের ইংরেজি শেখাতে ৬-১২ মাস লাগে
মূল কারণসমূহ
- স্বাধীনতার পর বাংলা ভাষাকে অগ্রাধিকার দেওয়ায় ইংরেজির মান কমেছে
- কারিগরি শিক্ষাকে “দ্বিতীয় শ্রেণির” হিসেবে দেখা হয়
- জিডিপির মাত্র ০.২% উচ্চশিক্ষা/কারিগরি শিক্ষায় বরাদ্দ
- শিক্ষকদের ইংরেজি ও আধুনিক প্রশিক্ষণ নেই
প্রস্তাবিত সমাধান
১. পাঠ্যক্রমে ২০% টেকনিক্যাল ইংরেজি (ESP) বাধ্যতামূলক করা
২. ব্রিটিশ কাউন্সিল/আইইএলটিএস প্রস্তুতি কোর্স চালু
৩. শিল্প-প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ ইন্টার্নশিপ ও প্রকল্প
৪. পলিটেকনিকের জন্য জিডিপির কমপক্ষে ১% বরাদ্দ
৫. বি.এসসি.-তে ল্যাটারাল এন্ট্রি সহজ করা এবং পদোন্নতিতে ৩০% কোটা নিশ্চিত করা
৬. প্রতি বছর স্নাতকদের দক্ষতা ও ইংরেজি মানের ট্রেসার স্টাডি
উপসংহার
বাংলাদেশের ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং প্রোগ্রাম দেশের মধ্যম স্তরের কারিগরি জনবল তৈরির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু পুরনো পদ্ধতি, অবকাঠামোর অভাব এবং সবচেয়ে বড় কথা ইংরেজি ভাষার চরম দুর্বলতার কারণে লক্ষাধিক তরুণ প্রকৌশলী বিশ্বমানের জ্ঞান ও সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এই সমস্যা সমাধান না হলে ভিশন-২০৪১-এর স্মার্ট বাংলাদেশ গড়া কঠিন হয়ে যাবে। অবিলম্বে পাঠ্যক্রম আধুনিকীকরণ, ইংরেজি শিক্ষার জোরদারকরণ এবং নীতিগত সংস্কারের মাধ্যমে এই প্রোগ্রামকে পুনর্জীবন দেওয়া সম্ভব এবং জরুরি।
Leave a Reply